IoT

ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) হলো প্রস্তাবিত এমন একটি নেটওয়ার্ক যেখানে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিসিপত্র নেটওয়ার্কে যুক্ত থেকে পরস্পরের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করতে পারে।

 

ইন্টারনেট অফ থিংস কি এবং কেন জরুরী?

ইন্টারনেট অফ থিংসের ধারণা নতুন কিছু নয়। প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাটি নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা করে যাচ্ছেন। সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে ইন্টারনেট সংযুক্ত টোস্টার উন্মোচন করা হয় যার মাধ্যমে আইওটির অগ্রযাত্রা শুরু হয়।

আইওটি হল মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিভাইস সংযুক্ত করা যা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বা বিভিন্ন কাজে সাহায্য করবে। উদাহরণ হিসেবে স্মার্ট ফ্রিজের কথা বলা যেতে পারে। আইওটি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে স্মার্ট ফ্রিজ হবে এমন একটি যন্ত্র যা নিজ থেকেই ভেতরে প্রয়োজনীয় খাদ্য আছে কিনা তা শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে ফ্রিজের ভেতরে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে যা ফ্রিজের ভেতরের অবস্থা পরিদর্শন করে গ্রাহককে টেক্সটের মাধ্যমে সামগ্রিক অবস্থা জানাবে।

যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যেখানে তাদের সরকার এনার্জি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানদের স্মার্ট মিটার ব্যবহার করতে বলেছে। এই মিটারে রয়েছে বিশেষ ফিচার যার ফলে রোদেলা দিনে হিটারের তাপমাত্রা কমে আসবে কিংবা কেউ বাসায় না থাকলে হিটার বন্ধ হয়ে যাবে।

অবশ্য আইওটি শুধু ঘরে ব্যবহার উপযোগী যন্ত্রপাতি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইওটির মূল লক্ষ্য ‘স্মার্ট সিটি’ তৈরি করা যেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রে পণ্যের মান এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সেন্সর এবং আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হবে।

স্মার্ট মিটারের কথাই ধরা যাক। স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় ঠিক কতটুকু এনার্জি আমাদের দরকার এবং কখন ঘরের হিটার বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকা উচিত। এর ফলে শক্তির অপচয় কমে আসবে যা নিশ্চিত ভাবেই উপকার বয়ে আনবে। সবমিলিয়ে আইওটি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে সমগ্র মানবজাতির জন্যই তা ভাল ফল বয়ে আনবে।

আইওটি কি নিরাপদ?

প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিরই কিছু না কিছু খুঁত থাকে। আইওটির ক্ষেত্রে যথেষ্ট নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করা মূল বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইওটি ডিভাইসসমূহে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ডেটা সংরক্ষিত থাকে। এই যেমন স্মার্ট মিটার জানে কখন ব্যবহারকারী ঘরে আছেন কিংবা তিনি কি ধরণের যন্ত্র ব্যবহার করেন। এই তথ্যগুলো অন্যান্য ডিভাইসেও শেয়ার করা হয় এবং প্রস্তুতকারী কোম্পানিটির ডেটাবেসে সংরক্ষিত থাকে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আইওটি ডিভাইসসমুহে গোপনীয়তা রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নিজেদের দাবি সত্য প্রমাণ করতে তারা বেবি মনিটর থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় আলোকব্যবস্থা, স্মার্ট ফ্রিজ এমনকি ট্রাফিক সিগন্যাল ও হ্যাক করতে সক্ষম হয়েছেন।

অবশ্য আইওটি সংক্রান্ত ব্যাপারে এখনো হ্যাকারদের তেমন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু স্মার্ট হোমের ডিভাইসসমূহ হ্যাক করার ফলে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে সাইবার অপরাধ বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবমিলিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইওটিকে নিরাপদই বলা চলে। বাসায় স্মার্ট মিটারের মতন ডিভাইস ব্যবহারে বড় ধরনের সমস্যা বা হ্যাকিংয়ের মুখোমুখি হওয়ার ভয় তাই কম। তবে ব্যবহারকারীরা ভবিষ্যতে হ্যাকিং থেকে কতটা নিরাপদ থাকবেন তা হবেনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

ব্যবসাক্ষেত্রে আইওটির প্রভাব কতটুকু?

ব্যবসা বাণিজ্যে আইওটির ব্যবহার অনেকটা নির্ভর করবে আপনি কোন শিল্প মাধ্যমে কাজ করছেন তার উপর। উৎপাদন শিল্পে আইওটি ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং লোকবল সংগঠনের কাজে আইওটি ব্যাবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে শস্য ফলন বৃদ্ধি এবং গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের কাজে সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে।

এরকম অসংখ্য উদাহরণ টেনে বলা যায়, কম্পিউটার কিংবা ওয়েবের মত আইওটিও একটা সময় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। তবে এক্ষেত্রে একটি জিনিস মাথায় রাখা উচিত- যখন কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সেন্সর বা ডিভাইস ব্যবহার করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ভাল ফল আসবে বলে আশা করা যায়। এই যেমন স্মার্ট টি মেইকারের কথাই ধরা যাক। আপনার যখনই চা পানের ইচ্ছা করবে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জন্য চা চলে আসলে বলাই বাহুল্য জীবনটা আরো সহজ হবে।

কিন্তু যখন ব্যক্তিবিশেষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে তখন তা মানবেতর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এই যেমন যদি নিরাপত্তা কার্ড যদি অফিসে কোন কর্মচারী কখন কোথায় আছেন বা কোন কাজে কতটুকু সময় ব্যয় করছেন তা শনাক্ত করারা কাজে ব্যবহার করা হয় তবে তা উল্টো ভাল আনতে পারে। বিশেষ করে কর্মচারীদের উপর অতিরিক্ত নজরদারী বরং উলটো ফল বয়ে আনবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আইওটি কি ভূমিকা পালন করবে?

বর্তমানে স্মার্ট পিল ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও অনেকেই এখন কব্জিতে স্মার্ট ওয়াচ বা ফিটনেস ব্যান্ড বেঁধে রাস্তায় দৌঁড়াতে নামছেন যা তাদের হৃদস্পন্দন নির্ণয় করবে। এ সবই আইওটি প্রযুক্তির সফলতার সম্ভাবনা বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইনটেল থেকে বানানো স্মার্ট ওয়াচের মাধ্যমে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি চলাফেরা করতে কতটুকু কাঁপুনি অনুভব করেন তার সঠিক পরিমাণ জানা যাবে। ‘সোনাম্বা’ বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কার্যাবলি মনিটর করে কোন ব্যতিক্রম হলে তা শনাক্ত করে। এছাড়া হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন শনাক্ত করার জন্য ‘এলাইভ কোর’ ব্যবহার করতে পারেন।

মূলত স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি বিষয় যেখানে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের মাধমে রোগ নির্ণয়, নিরাময় বা বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। তাই এক্ষেত্রের উন্নতিতে আইওটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।

ইন্টারনেট অফ থিংস কি আসলেই বাস্তব?

আইওটি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্ভবত সেরা প্রশ্ন হচ্ছে- আদৌ এটি বাস্তব জীবনে রূপান্তর করা সম্ভব কিনা।

এক্ষেত্রে প্রশ্নটির উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। প্রযুক্তি বিষয়ক নতুন পণ্য বাজারে এলে তার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে পণ্যের প্রচারণা, বাজারজাতকরণ এবং বিশেষ কৌশলের উপর। তাই আগে থেকেই প্রযুক্তিবিষয়ক নতুন ধারণা সফল হবে কিনা তা অনুমান করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরুপ- অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রথম আইফোন বাজারে এলে পণ্যটির ব্যাপারে পরিহাস করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় আইফোন গ্রাহক মহলে ভালই সাড়া ফেলেছে।

তবে ইন্টারনেট অফ থিংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদাই। আইওটি ধারণার প্রেক্ষাপট এতই বিশাল যে শুধু একটি প্রকল্প বা পণ্য দিয়ে তার সাফল্য, ব্যর্থতা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। স্মার্ট ফ্রিজের কথা ধরা যাক। এই পণ্যটি বাজারে এলে একদিকে যেমন ভবিষ্যতে দরকারি উপকরণ হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে আবার তুলনামূলক কম উপযোগীও হতে পারে। তবে স্মার্ট ফ্রিজ বানানোর পেছনে ব্যবহারিত প্রযুক্তি জ্ঞান অর্থ্যাৎ রোজকার জীবনে বিভিন্ন কাজে মানুষের সাহায্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে সেন্সর যুক্ত করার ধারণা অবশ্যই চলতে থাকবে।

আজ থেকে এক যুগ পরে স্মার্ট মিটার বা ফ্রিজের মত যন্ত্র হয়তো রোজ ব্যবহার করা হবে। আমরা হয়তো তখন এইসব যন্ত্রগুলোকে আইওটি বলবো। অথবা হয়তো নতুন কোন নামে সংজ্ঞায়িতই করব না। ঠিক যেমন এক সময়ে স্মার্টফোন নামে পরিচিত ডিভাইসগুলো এখন আমাদের কাছে সাধারণ ফোন বলেই মনে হয়।

তাই যে নামেই ডাকা হোক না কেন, আইওটি আসলেই বাস্তব। তবে ভবিষ্যতে আইওটি আসলে কি রূপে আমাদের সামনে আসবে তার উত্তর পেতে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

লেখার উৎসঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, লেখকঃ নাইব মুহাম্মদ রিদোয়ান, লিংকঃ https://bangla.bdnews24.com/tech/article974421.bdnews

38 total views, 1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *